Trending

ছাগল পালন পদ্ধতি জাত খাদ্য বাসস্থান ও চিকিৎসা

দেশী ছাগল পালন পদ্ধতি

ছাগল পালন পদ্ধতি : ছাগল এমন একটি প্রাণী, যে প্রাণী থেকে আমরা দুধ মাংস এবং দামি চামড়া পেয়ে থাকি। ছাগল

পালন আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর পূর্বে থেকে প্রচলন শুরু হয়েছে বলে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ ধারণা করে আসছেন।

বর্তমানে ছাগল পালন হচ্ছে একটি লাভজনক ব্যবসা। ছাগলকে বলা হয় গরীবের গাভী। ছাগল পালন করে অনেক অসহায়

পরিবার আজ হয়েছে স্বাবলম্বী। ছাগল পালন পদ্ধতি এই লেখায়  ছাগল পালন সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা করব, যাতে

করে সহজেই একটি মানুষ এই লেখা পড়ে ছাগল পালন শুরু করতে পারে। চলুন ধাপে ধাপে ছাগল পালন সম্পর্কে পরিপূর্ণ

আলোচনা করি।

ছাগলের ইতিহাস

জেনেটিক মাধ্যম বিশ্লেষণ করে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ নিশ্চিত করেছেন যে, জাগ্রোস পর্বতমালার বন্য বেজার হরেক্স হয়ত

গৃহপালিত ছাগলের মূল উৎস। সর্বপ্রথম কৃষকরা বন্য ছাগল পালন শুরু করেন। এখন থেকে ১০,০০০ হাজার বছর পূর্বে

ইরানের জাগ্রোস পর্বতমালার ইউফ্রেটিস নদীর উপত্যকায়  গঞ্জ দারেহে ছাগলের দেহের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়।

আবার পশ্চিম এশিয়া ৮ থেকে ৯ হাজার বছর পূর্ব থেকে ছাগল পালন শুরু হয়েছে বলে  প্রত্নতাত্ত্বিকগণ  ধারণা করে

থাকেন। ডিএনএ অধ্যায়ন করে পাওয়া যায় যে, দশ হাজার বছর আগে থেকে বাড়িতে ছাগল পালন করা হয়েছে। আমরা

পূর্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখি যে, ছাগলের চামড়া ভ্রমনের সময় পানি ও মদ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হতো।

সেইসাথে মদ ও পানি বিক্রির জন্য ব্যবহার করা হতো ছাগলের চামড়া। আর মাংস ও দুধ পুষ্টিকর খাবার হিসেবে বিবেচিত

অনেক আগ হতেই।

ছাগলের জাত পরিচিতি

বিভিন্ন দেশ ও স্থানভেদে বিভিন্ন জাতের ছাগল পালন করে থাকে। যেমন সানেন ব্লাক বেঙ্গল, টোগেন বার্গ , বারবারি ও

যমুনাপারি। কিছু ডেইরি জাতের   ছাগল এবং কিছু  মাংস এবং দুধের জন্য পালন করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের আবহাওয়া

ও জলবায়ুর মধ্যে যমুনাপারি ছাগল পালন সবচেয়ে উত্তম। নিম্নে যমুনাপারি ছাগলের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হল।

যমুনাপারি ছাগলটি যমুনা নদীর নাম থেকে নামকরণ করা হয়েছে। এটা মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের একটি প্রজাতির

ছাগল। এই ছাগল সর্বপ্রথম ১৯৫৩ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানী করে করে এবং পরে দেশীয় জাতের সাথে শংকরায়ন

করা হয়। পরে এই  ছাগল পেরাকান এতাঁওয়া নামে পরিচিতি পায়।

ছাগলের শারীরিক গঠন

সাধারণত এই ছাগল মাথা বড় হয়। ছাগলের রং বেশিরভাগ সময় লালচে হয়। তবে কালো এবং সাদা কালো মিশ্রিত হয়ে

থাকে। এই ছাগলের জাতের মোধ্যে পুরুষ ছাগলের ১২০ ও মহিলা ছাগলের ওজন ৯০ কিলোগ্রাম হয়ে থাকে। এই ছাগলের

দুই থেকে আড়াই লিটার দুধ হয়ে থাকে। একসাথে দুই থেকে চারটা বাচ্চা দিয়ে থাকে ।

এ ছাগলের মাংসে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কম থাকে। এই জাতের ছাগলের কান লম্বা প্রায় ২৫ সেন্টিমিটার হয়। পাঁগুলো

লম্বা ওলান বড় থাকে।

ছাগলের প্রজনন প্রক্রিয়া

 এই জাতের ছাগল দেড় বছরের মধ্যে বাচ্চা প্রদান করে থাকে। একসাথে দুই থেকে চারটি বাচ্চা দিয়ে থাকে । ছাগলের

প্রজনন দুইভাবে করা হয় প্রথমত

পাঠা দ্বারা বা প্রাকৃতিক ভাবে :

একটি ছাগল যখন হিট আসে তখন প্রাকৃতিক ভাবে উপযুক্ত বয়স্ক পাঠা দ্বারা যখন প্রজনন কার্য করা হয় তখন তারে

প্রাকৃতিক ভাবে প্রজনন কার্যক্রম বলে থাকে।প্রাকৃতিক ভাবে প্রজনন কার্য করলে প্রজননের হার যেমন বেড়ে যায়, তেমনি

অর্থের অপচয় কম হয়।

 ডাক্তার দ্বারা/কৃত্রিম প্রজনন:

একটি ছাগল যখন হিট আসে তখন আমরা অনেকেই ছাগলের জাত উন্নয়ন করার জন্য এবং অনেক বেশি নিশ্চিত হওয়ার

জন্য ডাক্তার এনে ছাগল প্রজনন করিয়ে থাকি। এক্ষেত্রে অবশ্য আমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হয়।

কিন্তু অন্যদিকে ছাগলের জাত উন্নয়ন শত ভাগ নিশ্চিত হয়।

ছাগলের বাসস্থান

ছাগল সাধারণত পালন করা হয় দুধ ও মাংসের জন্য।  এছাড়া  ছাগলের চামড়ার চাহিদা বিশ্ববাজারে ব্যাপক হারে বেড়ে

চলেছে। ছাগল হলো সৌখিন প্রাণী এরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গা পছন্দ করে। আমরা যদি ছাগলের ঘর তৈরি করতে চাই,

প্রথমেই খেয়াল রাখতে হবে, পরিষ্কার দুর্গন্ধমুক্ত উষ্ণ ও পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করে এমন জায়গা নির্ধারণ করতে

হবে।

স্যাঁত স্যাতে বদ্ধ, অন্ধকার ও গোবর যুক্ত স্থান যদি নির্বাচন করি, তবে ব্যাকটেরিয়ার কারণে বিভিন্ন রোগবালাই হতে পারে।

যেমন নিউমোনিয়া,চর্ম রোগ, ডায়রিয়া,একথাইমা ও নানা রকমের সংক্রামক ও পরজীবি রোগ হতে পারে। এতে করে

ছাগলের উৎপাদন ক্ষমতা ও প্রজনন দক্ষতা কমে যায়। একজন আদর্শ খামারি অবশ্যই খোলা স্থানে ঘর নির্মাণ করবেন।

ছাড়লের ঘরটি  পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা এবং দক্ষিণ দিকে খোলা রাখবে। নিম্নে ধাপে ধাপে ছাগলের ঘর নির্মাণ পদ্ধতি আলোচনা

করা হলো।

  • ছাগলের খামার অবশ্যই উঁচু ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আছে এমন জায়গা নির্বাচন করতে হবে। বন্যা বা বৃষ্টির পানি যেন খামারে সরাসরি প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • এর ঘর নির্মাণ করার জন্য ছন,বাঁশ,খড়,টিন,গোলপাতা,ইট ব্যবহার করতে পারবেন।
  •  মাচা তৈরিতে বাঁশ ও কাঠ ব্যবহার করতে পারবেন। মাচার  নিচের সহজেই যেন মলমূত্র বাহির করার ব্যবস্থা থাকে ।  মাচা ১ সেন্টিমিটার ফাঁকা থাকতে হবে। মেঝে থেকে মাচার উচ্চতা ১.৫ মিটার এবং মাচা থেকে ছাদেরে  উচ্চতা ১.৮ থেকে ২.৪ মিটার।
  • মেঝে যদি মাটির হয় তাহলে বালি দিতে হবে। আবার শীতকালে বেড়া চট দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।পাঁচ থেকে ছয় ইঞ্চি মোটা করে খড়ের বিছানা দিতে হবে।
  • বিভিন্ন বয়সের ছাগলকে আলাদা রাখতে হবে। দুগ্ধবতি, গর্ভবতি ছাগল গুলোকে এক সাথে রাখতে হবে। শীতকালে রাতের বেলা ছাগলকে ও ছাগলের বাচ্চাকে একসাথে ব্রুডিংয়ে রাখতে হবে।

ছাগল পালন পদ্ধতি এর ছাগলের দানাদার খাবার তৈরি

একটি ছাগল কে তার বয়স গঠন অনুসারে ১০০ গ্রাম থেকে ৫০০ গ্রাম খাবার প্রদান করতে হয়। এবং সাথে অর্ধেক কাচাঁ

ঘাস বা পাতা জাতীয়  খাবার প্রদান করতে হবে। আসুন আমরা ছাগলের দানাদার খাদ্যের একটি তালিকা প্রদান করব যে

খানে আমরা ১০০ কেজি দানাদার খাদ্য তৈরি করা দেখাবো।

মোট খাদ্য ১০০ কেজি:

  •  ভুট্টা ভাঙ্গা 50 ভাগ।
  • সয়াবিন খৈল ৩৭ ভাগ।
  • চিটা গুড় -৬ ভাগ ।
  • লবন- ১ ভাগ।
  • চুনাপাথর- ৩ ভাগ।
  • মিনারেল মিক্স-৩ ভাগ।

আপনার প্রয়োজন মত খাবার তৈরী করতে শুধু পরিমানে কম বা বেশি করে নিবেন।

ছাগল পালন পদ্ধতি এর ছাগলের টিকা প্রদান

ছাগলের সাধারণত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি।  কিছু টিকা ও সহজ কিছু নিয়ম মেনে চললে আমরা ছাগল পালন

করে লাভবান হতে পারব। আমরা যদি বাহিরের মানুষকে খামারে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করি সেই সময় তাঁকে

জীবানুনাশক দ্ধার তারা হাত-পা ও জুতা জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। সবসময় খাবার পাত্র, খাবার ও পানি পরিষ্কার রাখতে

হবে ও  খাওয়াতে হবে। আর ছাগলের যে রোগ হয় সেগুলো হলো  গোটপক্স, পিপিআর, ক্ষুরা, রুমেলসেন ও এনথ্রাক্স। আর

এসব রোগ হবার আগেই যদি আমরা  টিকা দিয়ে রাখি তাহলে ছাগল পালন অনেক সহজ হবে। ছাগলেকে টিকা প্রদান

করলে আর তেমন কোন জটিল রোগ দেখা দেয়না।

ছাগল পালন পদ্ধতি এর শেষ কথা

পরিশেষে বলা যায়, আমরা যদি ছোট পরিসরে কিংবা বড় পরিসরে ছাগল পালন করতে চাই। এবং ছাগল পালন করে

স্বাবলম্বী হতে চাই তবে উপরোক্ত ছাগল পালন পদ্ধতি  লেখাটি আমাদের অনেক কাজে আসবে। এছাড়াও আপনাদের যদি ছাগল পালন বিষয়ে

আরো কোন কিছু জানতে ইচ্ছে করে বা জানার থাকে তাহলে আমাদের কমেন্ট বক্সে লিখতে পারেন । পরবর্তীতে আমরা

তার উত্তর দিব।

এই লেখাটি কষ্ট করে পড়ার জন্য আপনাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ।

আমাদের অন্যান্য বিষয় পড়তে পারেন:

Leave a Reply

Your email address will not be published.